সিঙ্গাপুর বাংলাদেশ হাইকমিশনে ই-পাসপোর্ট নবায়ন: আমার অভিজ্ঞতা ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র Bangladesh High Commission, Singapore Passport renewal





আজ আপনাদের সাথে শেয়ার করব সিঙ্গাপুরস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশনে (Bangladesh High Commission, Singapore) ই-পাসপোর্ট নবায়নের জন্য আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা। প্রবাস জীবনে একটি বৈধ পাসপোর্ট কত জরুরি, তা আমরা সবাই জানি। কিন্তু সেই জরুরি কাজটি সম্পন্ন করতে গিয়ে যে বাস্তবতার সম্মুখীন হতে হয়, তা আপনাদের সামনে তুলে ধরছি।

সকাল ৭টা: ধৈর্যের প্রথম পরীক্ষা


সকাল সাতটা—হাই কমিশনের গেটের সামনে যখন পৌঁছলাম, তখন সূর্যের তেজ তখনও তেমন ছড়ায়নি। কিন্তু সেখানে যা দেখলাম, তা আমাকে বেশ অবাক করল: অনেক মানুষের লম্বা লাইন! গেটে তখনও তালা ঝুলছে, আর প্রবাসীরা নিজেরাই ফ্লোরে বসে নিজেদের সিরিয়াল নিশ্চিত করে রেখেছেন। এখানে কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যবস্হা না থাকায়, নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়ার ভিত্তিতেই সবকিছু চলছিল।

চারপাশে সিলিং ফ্যান না থাকায় পরিবেশটা কিছুটা অস্বস্তিকর ছিল। এর মধ্যে এক পশলা বৃষ্টি বাইরের লাইনে দাঁড়ানো অসম্ভব করে তুলেছিল। এমন পরিস্থিতিতে, যখন নতুন আসা কেউ লাইনে আগে ঢোকার চেষ্টা করলেন, তখন উপস্থিত এক দায়িত্বশীল ভাই পরিস্থিতি সামাল দিলেন এবং সবাইকে লাইনের শেষে দাঁড়াতে বললেন—প্রবাসীদের এই স্বতঃস্ফূর্ত সহযোগিতা দেখে ভালো লাগল।

সকাল ৯টা: অপেক্ষার অবসান ও দাপ্তরিক প্রক্রিয়া


অবশেষে সকাল ৯টায় গেট খুলে দেওয়া হলো। সবাই দ্রুত উপরে ৪ তলায় পাসপোর্ট শাখায় পৌঁছলাম। সেখানে পৌঁছে প্রথমেই টোকেন সংগ্রহ করতে হলো। টোকেন হাতে পাওয়ার পর শুরু হলো টাকা জমা দেওয়ার জন্য অপেক্ষা। সিরিয়াল আসতেই NETS এর মাধ্যমে নির্ধারিত ফি জমা দিলাম।

টাকা জমা দেওয়ার পর্ব শেষ হতেই শুরু হলো পরবর্তী অপেক্ষা— ফিঙ্গারপ্রিন্ট ও ছবি তোলার (বায়োমেট্রিক এনরোলমেন্ট) জন্য। এই প্রক্রিয়াটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখানে আপনার বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহ করা হয়। ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করার পর যখন প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হলো, যেন হাফ ছেড়ে বাঁচলাম!

অবশেষে সমস্ত কাজ শেষ করে, পাসপোর্ট সংগ্রহের স্লিপটি নিয়ে হাসিমুখে বাসার পথে রওনা হলাম। লম্বা লাইন এবং অপেক্ষার ক্লান্তি তখন তথ্য পরিবর্তনের বা নতুন পাসপোর্টের প্রত্যাশায় অনেকটাই ফিকে হয়ে গেল।

আমার অভিজ্ঞতার আলোকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ:


* ব্যবস্হাপনার উন্নতি: 

গেটের সামনে খোলা জায়গায় একটি সিলিং ফ্যান বসানো হলে অপেক্ষারত প্রবাসীরা কিছুটা স্বস্তি পেতেন।

* লাইনে টোকেন সিস্টেম: 

লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করার সময় যদি QR কোড স্ক্যান করে অনলাইনে টোকেন নেওয়ার ব্যবস্থা করা যায়, তবে অযথা ভিড় এবং বিশৃঙ্খলা অনেকটাই কমে যাবে।

* আবেদনের পূর্বে প্রস্তুতি: 

অনলাইনে আবেদন এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র গুছিয়ে গেলে কাউন্টারের কাজ দ্রুত শেষ হয়।

পাসপোর্ট নবায়ন (e-Passport Reissue) এর জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও শর্তাবলী (সিঙ্গাপুরস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশন অনুযায়ী)

পাসপোর্ট নবায়নের জন্য বাংলাদেশ হাইকমিশন, সিঙ্গাপুরের (Bangladesh High Commission, Singapore) অফিসিয়াল নির্দেশনা অনুযায়ী নিম্নলিখিত কাগজপত্র ও শর্তাবলী অনুসরণ করতে হবে:

১. প্রয়োজনীয় কাগজপত্র (Documents Required)


| ক্রম | কাগজের বিবরণ | বিশেষ নোট |

|---|---|---|

| ১. | অন-লাইনে পূরণকৃত ফর্মের সামারি পেজ (Summary Page) | e-passport.gov.bd ওয়েবসাইট থেকে আবেদন করার পর প্রিন্ট করতে হবে। |

| ২. | বর্তমান মূল পাসপোর্ট | অবশ্যই সাথে নিয়ে যেতে হবে। |

| ৩. | জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) অথবা ইংরেজি অনলাইন জন্মনিবন্ধন সনদ (BRC) | বর্তমান পাসপোর্টের তথ্যের সাথে মিল রেখে আবেদন করতে হবে। তথ্যের গরমিল থাকলে পাসপোর্টে দেরি হতে পারে। |

| ৪. | ওয়ার্ক পারমিট (Work Permit) / ভিসা / সিঙ্গাপুরে অবস্থানের বৈধ অনুমতিপত্র | সিঙ্গাপুর সরকারের দেওয়া যেকোনো বৈধ ডকুমেন্ট। |

| ৫. | নবজাতকের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত নথি | ১ কপি 3R সাইজের ছবি, বাবা-মায়ের অনলাইন ইংরেজি জন্ম সনদ, পাসপোর্ট, ম্যারেজ সার্টিফিকেট এবং নিকাহ-নামার ফটোকপি। |

| ৬. | দৃষ্টিশক্তিহীন (Visually Impaired) হলে | ডাক্তারের সনদপত্র। |

২. ছবি তোলার শর্তাবলী ও সাধারণ নির্দেশাবলী


* পোশাক:
 বায়োমেট্রিক এনরোলমেন্টের জন্য সাদা রঙের পোশাক (উপরের অংশ) পরে না আসার অনুরোধ করা হয়েছে।

* ফি পরিশোধ
হাইকমিশনের পাসপোর্ট কাউন্টারে শুধুমাত্র NETS এর মাধ্যমে নির্ধারিত ফি পরিশোধ করতে হবে।

* সময়সূচী:

* ফি প্রদান ও বায়োমেট্রিক এনরোলমেন্ট (জমা): 
সকাল ৯:০০ - দুপুর ১২:৩০ টা পর্যন্ত (শুধুমাত্র অফিস ডে-তে)।

* পাসপোর্ট ডেলিভারি (সংগ্রহ): 
বেলা ২:০০ টা - ৪:৩০ টা পর্যন্ত (শুধুমাত্র অফিস ডে-তে)।

* উপস্থিতি
পাসপোর্ট গ্রহণ করার সময় আবেদনকারীকে সশরীরে উপস্থিত থাকতে হবে।

* যাচাই
এনরোলমেন্ট শেষে যে রিসিট বা কালেকশন স্লিপ দেওয়া হবে, তাতে আপনার তথ্যগুলো সঠিক আছে কিনা, তা অবশ্যই যাচাই করে তবেই কাউন্টার ত্যাগ করুন।

গুরুত্বপূর্ণ দ্রষ্টব্য: 
পাসপোর্ট সংক্রান্ত যেকোনো আপডেটের জন্য www.epassport.gov.bd ওয়েবসাইটে 'Check Status' অপশনে ক্লিক করে আপনার আবেদনের অবস্থা জানা যেতে পারে। আপনার পাসপোর্ট প্রস্তুত হলে ই-মেইলে কনফারমেশন মেসেজ যাবে।

তাদের কোনো ফটোকপির মেসিন নেই।

যদি নিবন্ধনের (registration) সময় ইংরেজি নামের বানান বা মিল না থাকে, তাহলে তারা একটি ফর্ম দেবে।

 আপনি চাইলে সেই ফর্মের একটি কপি করে রাখতে পারেন, অথবা সরাসরি পূরণ করে জমা দিতে পারেন।

এই ক্ষেত্রে পারমিটের ফটোকপি লাগবে, যা ২০৪ নম্বর রুমে সত্যায়িত (certified) করে নিতে হবে। তাই আগে থেকেই পারমিটের একটি কপি সাথে রাখাই ভালো।

উদাহরণস্বরূপ —
নিবন্ধনে নাম লেখা আছে: বাংলায়: মোঃ হাসান, ইংরেজিতে: Hasan
কিন্তু পুরোনো পাসপোর্টে আছে: Md. Hasan

তাহলে সমস্যা হতে পারে। এক্ষেত্রে নিবন্ধনে Md Hasan লেখার জন্য বাংলাদেশের ইউনিয়ন পরিষদ থেকে একটি প্রত্যয়নপত্র (certificate) সংগ্রহ করতে বলবেন।

অন্যথায়, উপরে উল্লেখিত ফর্মটি পূরণ করে জমা দিতে হবে এবং পাসপোর্টের তথ্য সংশোধন (data correction) প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।

।  

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

Loading posts...